বিদেশে যাওয়ার আগে মেডিকেলে আনফিট হতে পারেন যেসব কারণে!
বিদেশে কাজের উদ্দেশ্যে যাওয়ার আগে একজন কর্মীকে ভিসা, পাসপোর্ট ও চাকরির চুক্তির পাশাপাশি স্বাস্থ্য পরীক্ষার বিষয়েও সতর্ক থাকতে হয়।
কারণ, নির্ধারিত স্বাস্থ্য পরীক্ষায় অনুপযুক্ত বিবেচিত হলে বিদেশে যাওয়ার প্রক্রিয়া আটকে যেতে পারে। এমনকি মেডিকেল পরীক্ষায় অনিয়ম, ভুল তথ্য বা অননুমোদিত সেন্টার থেকে পরীক্ষা করানোর কারণে ভিসা প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হতে পারে।
তবে সব দেশের মেডিকেল পরীক্ষার নিয়ম এক নয়। গন্তব্য দেশ, কাজের ধরন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী পরীক্ষার ধরন ও স্বাস্থ্যগত যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়। তাই বিদেশযাত্রার প্রস্তুতি নেওয়ার শুরুতেই মেডিকেল পরীক্ষা সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা জরুরি।
মেডিকেল পরীক্ষায় সাধারণত যেসব বিষয় দেখা হয়
বিদেশগামী কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষায় সাধারণত শারীরিক অবস্থা ও সংক্রামক রোগের উপস্থিতি যাচাই করা হয়।
গন্তব্য দেশের নিয়ম অনুযায়ী পরীক্ষার তালিকায় পরিবর্তন হতে পারে।
১. রক্ত পরীক্ষা: রক্তের বিভিন্ন উপাদান ও নির্দিষ্ট সংক্রামক রোগের উপস্থিতি যাচাই করা হয়।
২. বক্ষের এক্স-রে: ফুসফুসের অবস্থা এবং যক্ষ্মার মতো রোগের লক্ষণ পরীক্ষা করা হতে পারে।
৩. প্রস্রাব পরীক্ষা: কিডনি ও মূত্রনালির কিছু সমস্যা শনাক্তে পরীক্ষা করা হয়।
৪. শারীরিক পরীক্ষা: উচ্চতা, ওজন, রক্তচাপ, দৃষ্টিশক্তি ও সামগ্রিক শারীরিক অবস্থা দেখা হয়।
৫. সংক্রামক রোগের পরীক্ষা: গন্তব্য দেশের নিয়ম অনুযায়ী এইচআইভি, হেপাটাইটিস বি ও সি, সিফিলিসসহ নির্দিষ্ট রোগের পরীক্ষা করা হতে পারে।
৬. অন্যান্য পরীক্ষা: কিছু ক্ষেত্রে হৃদ্যন্ত্র, মানসিক স্বাস্থ্য বা নির্দিষ্ট পেশার উপযোগিতা যাচাইয়ের জন্য অতিরিক্ত পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে।
মনে রাখতে হবে, এসব পরীক্ষা সব দেশের জন্য বাধ্যতামূলক নয়। সংশ্লিষ্ট দেশের অনুমোদিত মেডিকেল প্রটোকলই চূড়ান্ত।
কোন দেশে কী ধরনের মেডিকেল পরীক্ষা প্রয়োজন?
দেশভেদে স্বাস্থ্য পরীক্ষার নিয়মের পার্থক্য রয়েছে। যেমন-
- সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশ: জিসিসি দেশগুলোতে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে Wafid কর্মসূচির আওতায় নির্ধারিত মেডিকেল পরীক্ষা করতে হয়। এতে রক্ত পরীক্ষা, বুকের এক্স-রে এবং শারীরিক পরীক্ষা অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে
- মালয়েশিয়া: দেশটির বিদেশি কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য FOMEMA নির্ধারিত ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে স্বাস্থ্য পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া ও কাজের অনুমতি পাওয়ার ক্ষেত্রে মেডিকেল ফিটনেস গুরুত্বপূর্ণ।
- বাহরাইন: দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিদেশি কর্মীদের শারীরিক পরীক্ষা, বুকের এক্স-রে, রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষা করা হয়। কিছু পেশার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত পরীক্ষাও প্রয়োজন হতে পারে।
মেডিকেল পরীক্ষার আগে যেসব প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি
পরীক্ষার দিন অপ্রয়োজনীয় জটিলতা এড়াতে কয়েকটি বিষয় আগে থেকেই নিশ্চিত করা উচিত।
পাসপোর্টের মূল কপি ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঙ্গে রাখতে হবে।
- মেডিকেল সেন্টারটি সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত কি না যাচাই করতে হবে।
- পরীক্ষার আগে কোনো ওষুধ সেবন করলে চিকিৎসককে জানাতে হবে।
- আগে থেকে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা অন্য কোনো রোগ থাকলে তা গোপন করা যাবে না।
- পরীক্ষার আগে খাবার খাওয়া যাবে কি না, তা সংশ্লিষ্ট মেডিকেল সেন্টার থেকে জেনে নিতে হবে। কিছু রক্ত পরীক্ষার
- জন্য খালি পেটে থাকার প্রয়োজন হতে পারে।
- আগের চিকিৎসার রিপোর্ট ও ব্যবহৃত ওষুধের তথ্য সঙ্গে রাখা ভালো।
মেডিকেলে আনফিট হলে কী করবেন?
মেডিকেল পরীক্ষায় আনফিট বা অযোগ্য ঘোষিত হলে অনেক কর্মী দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। তবে প্রথমেই পরীক্ষার ফলাফলে কী কারণ উল্লেখ করা হয়েছে, তা জানা জরুরি।
কোনো রোগ বা শারীরিক সমস্যার কারণে আনফিট হলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মাধ্যমে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা করানো যেতে পারে। তবে চিকিৎসকের ব্যক্তিগত ফিটনেস সনদ থাকলেই বিদেশে যাওয়ার অনুমতি নিশ্চিত হয় না। সংশ্লিষ্ট দেশের নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
বিশেষ করে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর Wafid ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট সংক্রামক রোগ এবং কিছু গুরুতর শারীরিক সমস্যাকে মেডিকেল আনফিট হওয়ার কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
আরও পড়ুনঃ মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের জন্য ৫১ অনুমোদিত মেডিকেল সেন্টারের তালিকা প্রকাশ
মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়ায় সম্প্রতি মেডিকেল পরীক্ষা নিয়ে নতুন নির্দেশনা দিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।
- ৩১ অক্টোবর ২০২৬ থেকে অনুমোদিত মেডিকেল সেন্টারে পরীক্ষা শুরু হয়েছে।
- মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের মেডিকেল পরীক্ষার ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ৮ হাজার টাকা।
- নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অনুমতি নেই।
- ৬ নভেম্বর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মালয়েশিয়ার জন্য ৫১টি অনুমোদিত মেডিকেল সেন্টারের তালিকা প্রকাশ করেছে FWCMS।
- কোনো নির্দিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সির নিয়ন্ত্রণাধীন সেন্টার থেকে পরীক্ষা করানো বাধ্যতামূলক নয়। কর্মীরা যেকোনো অনুমোদিত সেন্টারে পরীক্ষা করাতে পারবেন।
- মেডিকেল স্লিপ বা সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রের নামে অতিরিক্ত টাকা দাবি করলে অভিযোগ করতে হবে।
।
বিদেশগামী কর্মীদের মেডিকেল পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে প্রতারণার আশঙ্কাও রয়েছে। কিছু অসাধু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান অনুমোদন ছাড়াই পরীক্ষা করানোর কথা বলে কর্মীদের কাছ থেকে পাসপোর্ট ও টাকা নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে।
এ কারণে-
অনুমোদিত মেডিকেল সেন্টারের তালিকা যাচাই করতে হবে।
- রসিদ ছাড়া কোনো টাকা দেওয়া যাবে না।
- মেডিকেল পরীক্ষার নামে দালালের হাতে পাসপোর্ট দেওয়া যাবে না।
- পরীক্ষার ফলাফল ও মেডিকেল সনদের তথ্য যাচাই করতে হবে।
- কোনো অনিয়ম হলে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে।
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, বিদেশ যাওয়ার আগে অনুমোদিত মেডিকেল সেন্টারে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো জরুরি।
বিদেশে যাওয়ার আগে শুধু মেডিকেল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন থাকা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়া এবং গন্তব্য দেশের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাও জরুরি।
কোনো রোগ থাকলে তা গোপন না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। পাশাপাশি মেডিকেল পরীক্ষার ফলাফল, চিকিৎসার কাগজপত্র ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসংক্রান্ত নথির কপি নিজের কাছে সংরক্ষণ করা ভালো।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মেডিকেল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার নিশ্চয়তা দিয়ে কেউ আগাম টাকা চাইলে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ মেডিকেল ফিটনেস নির্ধারণের ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট অনুমোদিত চিকিৎসাকেন্দ্র ও কর্তৃপক্ষের।




একটি মন্তব্য